শীতে জমে গিয়েও বেঁচে থাকে যে ব্যাঙ!
কল্পনা করুন, প্রচণ্ড শীতের মধ্যে একটি ছোট ব্যাঙ পড়ে আছে বরফে ঢাকা বনের মাটিতে।
লেখক: পৃথিবীনামা

কল্পনা করুন, প্রচণ্ড শীতের মধ্যে একটি ছোট ব্যাঙ পড়ে আছে বরফে ঢাকা বনের মাটিতে।
তার শরীর ঠান্ডায় শক্ত হয়ে গেছে। কোনো নড়াচড়া নেই। শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ। এমনকি হৃদপিণ্ডের স্পন্দনও থেমে গেছে!
দেখে মনে হতে পারে, ব্যাঙটি মারা গেছে।
কিন্তু কয়েক মাস পর বসন্তের উষ্ণতা ফিরে এলে ঘটতে পারে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা।
ব্যাঙটির শরীরের বরফ গলতে শুরু করে। হৃদপিণ্ড আবার স্পন্দিত হয়। আর কিছু সময় পর সে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা শুরু করে!
এটি কোনো কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়।
উত্তর আমেরিকায় সত্যিই এমন একটি ব্যাঙ রয়েছে, যার নাম Wood Frog, বৈজ্ঞানিক নাম Lithobates sylvaticus।
এই ছোট্ট উভচর প্রাণীটি এমন এক ক্ষমতা অর্জন করেছে, যা অধিকাংশ মেরুদণ্ডী প্রাণীর জন্য প্রায় অকল্পনীয়।
শরীরের উল্লেখযোগ্য অংশ জমে যাওয়ার পরও এটি বেঁচে থাকতে পারে!
শীতকালে ব্যাঙটির কী হয়? উত্তর আমেরিকার অনেক ব্যাঙ শীতের সময় পানির নিচে আশ্রয় নেয়।
কিন্তু উড ফ্রগের কৌশল আলাদা।
শীত আসার আগে এটি বনের মাটিতে ঝরে পড়া পাতা ও অন্যান্য উদ্ভিদাবশেষের নিচে আশ্রয় নেয়।
তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে ব্যাঙটির শরীরে বরফ তৈরি হতে শুরু করে।
প্রথমে পা ও শরীরের বাইরের অংশ জমে যায়। এরপর ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরেও বরফ জমতে থাকে।
একপর্যায়ে ব্যাঙটির হৃদস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অবস্থাতেও ব্যাঙটি মৃত নয়!
এর শরীর এমনভাবে অভিযোজিত যে বরফ গলার পর গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় কাজগুলো আবার শুরু হতে পারে।
শরীরের ভেতরে বরফ জমলেও কোষ নষ্ট হয় না কেন? সাধারণত কোনো প্রাণীর কোষের ভেতরে বরফের স্ফটিক তৈরি হলে তা মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
বরফ জমার সময় কোষ থেকে পানি বেরিয়ে যাওয়ার কারণেও কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কিন্তু উড ফ্রগের শরীরে রয়েছে বিশেষ একটি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।
শরীর জমতে শুরু করলে ব্যাঙটির যকৃতে সঞ্চিত Glycogen দ্রুত ভেঙে প্রচুর Glucose তৈরি হয়।
এই গ্লুকোজ রক্তের মাধ্যমে বিভিন্ন কোষে পৌঁছে যায়।
গ্লুকোজ কোষের ভেতরে বরফ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমায় এবং জমে যাওয়ার সময় পানিশূন্যতার ক্ষতিকর প্রভাব সীমিত করতে সাহায্য করে।
পাশাপাশি Urea নামের আরেকটি পদার্থও কোষকে সুরক্ষা দেয়।
এসব পদার্থকে বিজ্ঞানীরা বলেন Cryoprotectants।
এগুলো অনেকটা প্রাকৃতিক অ্যান্টিফ্রিজের মতো কাজ করে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যাঙটির শরীরের সব পানি জমে যায় না।
বরফ মূলত কোষের বাইরের অংশে তৈরি হয়। সুরক্ষামূলক রাসায়নিক পদার্থগুলো কোষের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো রক্ষা করতে সাহায্য করে।
কতটা ঠান্ডা সহ্য করতে পারে এই ব্যাঙ? এখানেই রয়েছে আরও একটি বিস্ময়কর তথ্য।
২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আলাস্কার উড ফ্রগের শীতকালীন অভিযোজন পরীক্ষা করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, শীতের জন্য অভিযোজিত আলাস্কার উড ফ্রগ পরীক্ষাগারে মাইনাস ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় জমে যাওয়ার পরও বেঁচে থাকতে পারে।
তবে সব অঞ্চলের উড ফ্রগের এই ক্ষমতা সমান নয়।
এমনকি একই ব্যাঙের শীতকাল ও বসন্তকালের ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতার মধ্যেও বড় পার্থক্য থাকতে পারে।
ছয় মাসেরও বেশি সময় জমে থাকা সম্ভব? ২০১৪ সালে Journal of Experimental Biology-তে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় আলাস্কার প্রাকৃতিক পরিবেশে শীত কাটানো উড ফ্রগ পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষকেরা দেখতে পান, পর্যবেক্ষিত ব্যাঙগুলো গড়ে প্রায় ১৯৩ দিন টানা জমাট অবস্থায় ছিল।
অর্থাৎ ছয় মাসেরও বেশি সময়!
গবেষণায় পর্যবেক্ষিত ১৮টি ব্যাঙই বসন্তে বেঁচে ছিল।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার। কারণ পরীক্ষাগারের বাইরে প্রাকৃতিক পরিবেশেও উড ফ্রগের অসাধারণ শীতসহনশীলতার প্রমাণ পাওয়া যায়।
তাহলে কি ব্যাঙটি মারা গিয়ে আবার জীবিত হয়? না।
এখানে একটি বৈজ্ঞানিক পার্থক্য বোঝা জরুরি।
জমাট অবস্থায় উড ফ্রগের হৃদস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাস সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও তার কোষগুলো এমনভাবে সুরক্ষিত থাকে যে উষ্ণতা ফিরে এলে স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হতে পারে।
অর্থাৎ এটি মৃত্যুর পর পুনর্জীবন নয়।
এটি চরম ঠান্ডায় বেঁচে থাকার একটি বিশেষ জৈবিক অভিযোজন।
বিজ্ঞানীরা এই ক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করছেন। কারণ কোষ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ঠান্ডাজনিত ক্ষতি থেকে রক্ষা করার প্রক্রিয়া বোঝা ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষ করে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ ও প্রতিস্থাপনের গবেষণায় এই জ্ঞান কাজে লাগার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে উড ফ্রগের ক্ষমতা সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা এখনো সম্ভব হয়নি।
প্রকৃতির এক অসাধারণ বেঁচে থাকার কৌশল শীতের সময় যখন অনেক প্রাণী উষ্ণ অঞ্চলে চলে যায়, কেউ গভীর গর্তে আশ্রয় নেয়, আবার কেউ পানির নিচে অপেক্ষা করে, তখন ছোট্ট উড ফ্রগ বেছে নিয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ।
সে শীতের সঙ্গে লড়াই করে না।
বরং নিজের শরীরকে এমনভাবে প্রস্তুত করে, যাতে জমে যাওয়ার পরও বেঁচে থাকতে পারে।
বসন্ত ফিরে এলে বরফ গলে যায়। হৃদপিণ্ড আবার কাজ শুরু করে। ব্যাঙটি বেরিয়ে আসে পাতার নিচ থেকে।
তারপর শুরু হয় নতুন প্রজনন মৌসুম।
যে ঠান্ডা অধিকাংশ প্রাণীর জন্য প্রাণঘাতী, সেই ঠান্ডার মধ্যেই মাসের পর মাস টিকে থাকতে পারে এই ছোট্ট ব্যাঙ!
প্রকৃতি কখনো কখনো আমাদের এমন কিছু দেখায়, যা কল্পবিজ্ঞানের গল্পকেও হার মানায়।
উৎস ও আরও পড়ুন
গল্পটি শেয়ার করুন
এরপর পড়তে পারেন
এই গল্পের বিষয় ও সূত্র ধরে নির্বাচিত আরও পাঠ।

মানুষকে মৌচাক দেখিয়ে দেয় যে পাখি!
আফ্রিকার গভীর বনাঞ্চলে একজন মানুষ মধু খুঁজতে বেরিয়েছেন। কিন্তু তিনি একা নন। তাঁর সঙ্গী একটি ছোট বুনো পাখি, যে গাছ থেকে গাছে উড়ে তাঁকে পথ দেখাচ্ছে।
সম্পূর্ণ পড়ুন
৪৭ হাজার গাছ, অথচ একটি জীব!
কল্পনা করুন, আপনি একটি বিশাল বনের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন।
সম্পূর্ণ পড়ুন
শীতে রেইনডিয়ারের চোখ নীল হয়ে যায় কেন?
একই রেইনডিয়ারের চোখ গ্রীষ্মে দেখলে ভেতরে সোনালি আভা দেখা যেতে পারে। কিন্তু আর্কটিকের দীর্ঘ অন্ধকার শীত এলে সেই প্রতিফলন বদলে হয়ে যায় গভীর নীল।
সম্পূর্ণ পড়ুন