মানুষকে মৌচাক দেখিয়ে দেয় যে পাখি!
আফ্রিকার গভীর বনাঞ্চলে একজন মানুষ মধু খুঁজতে বেরিয়েছেন। কিন্তু তিনি একা নন। তাঁর সঙ্গী একটি ছোট বুনো পাখি, যে গাছ থেকে গাছে উড়ে তাঁকে পথ দেখাচ্ছে।
লেখক: পৃথিবীনামা

আফ্রিকার গভীর বনাঞ্চলে একজন মানুষ মধু খুঁজতে বেরিয়েছেন। কিন্তু তিনি একা নন। তাঁর সঙ্গী একটি ছোট বুনো পাখি, যে গাছ থেকে গাছে উড়ে তাঁকে পথ দেখাচ্ছে।
অবাক করার বিষয় হলো, পাখিটি শুধু মানুষের সঙ্গে যাচ্ছে না। সে জানে কোথায় বুনো মৌমাছির বাসা রয়েছে!
এই অসাধারণ পাখির নাম Greater Honeyguide (Indicator indicator)। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এই পাখি ও মানুষের মধ্যে এমন এক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যা প্রাণিজগতে অত্যন্ত বিরল। পাখিটি বিশেষ ডাক দিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারপর এক গাছ থেকে আরেক গাছে উড়ে মানুষকে মৌচাকের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু পাখিটি কেন এমন করে?
কারণ এখানে দুপক্ষেরই লাভ রয়েছে।
মানুষ ধোঁয়া ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে মৌমাছির বাসা খুলে মধু সংগ্রহ করে। আর পাখিটি খেতে পারে বাসা থেকে পাওয়া মৌমাছির মোম বা Beeswax। এই পাখির খাদ্যাভ্যাসের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি মোম হজম করতে পারে।
অর্থাৎ মানুষ পায় মধু, পাখি পায় মোম।
কিন্তু গল্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশটি এখনো বাকি! মানুষও এই পাখির সঙ্গে বিশেষ শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারে। মোজাম্বিকের Yao জনগোষ্ঠীর মধু সংগ্রহকারীরা পাখিকে ডাকতে ব্যবহার করেন একটি বিশেষ শব্দ, অনেকটা “Brrr-hm” এর মতো। ২০১৬ সালে Science জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, এই বিশেষ ডাক ব্যবহার করলে Honeyguide পাখির পথ দেখানোর সম্ভাবনা প্রায় ৩৩% থেকে বেড়ে ৬৬% হয়।
আর মৌচাক খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১৭% থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪%! অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করে মানুষ বুনো পাখির সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। তবে এখানেই শেষ নয়।
২০২৩ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আরও আশ্চর্যজনক তথ্য পান।
তানজানিয়ার Hadza জনগোষ্ঠী Honeyguide পাখিকে ডাকতে ব্যবহার করেন সুরেলা শিস। অন্যদিকে মোজাম্বিকের Yao জনগোষ্ঠী ব্যবহার করেন ভিন্ন ধরনের ডাক।
গবেষণায় দেখা যায়, দুই অঞ্চলের পাখিরাই নিজেদের এলাকার মানুষের প্রচলিত ডাকের প্রতি তুলনামূলক বেশি সাড়া দেয়। এর অর্থ, পাখিগুলো সম্ভবত স্থানীয় মানুষের ব্যবহৃত বিশেষ শব্দ চিনতে শেখে।
এটি শুধু একটি পাখির মানুষের উপকার করার গল্প নয়। এটি দুই ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার এক অসাধারণ উদাহরণ।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পাখিগুলো পোষা নয়। এগুলো সম্পূর্ণ বন্য প্রাণী।
মানুষের সঙ্গে তাদের সহযোগিতামূলক আচরণ প্রাকৃতিক পরিবেশেই গড়ে উঠেছে।
আমরা সাধারণত মনে করি, মানুষই প্রাণীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন কাজ শেখায়।
কিন্তু আফ্রিকার এই ছোট্ট পাখিটি আমাদের দেখায়, প্রকৃতিতে কখনো কখনো মানুষ এবং বন্য প্রাণী নিজেরাই একে অপরের সহযোগী হয়ে উঠতে পারে।
একটি ছোট পাখি, একটি বিশেষ ডাক, আর দুই প্রজাতির মধ্যে গড়ে ওঠা অবিশ্বাস্য সহযোগিতা!
উৎস ও আরও পড়ুন
গল্পটি শেয়ার করুন
এরপর পড়তে পারেন
এই গল্পের বিষয় ও সূত্র ধরে নির্বাচিত আরও পাঠ।

শীতে জমে গিয়েও বেঁচে থাকে যে ব্যাঙ!
কল্পনা করুন, প্রচণ্ড শীতের মধ্যে একটি ছোট ব্যাঙ পড়ে আছে বরফে ঢাকা বনের মাটিতে।
সম্পূর্ণ পড়ুন
শীতে রেইনডিয়ারের চোখ নীল হয়ে যায় কেন?
একই রেইনডিয়ারের চোখ গ্রীষ্মে দেখলে ভেতরে সোনালি আভা দেখা যেতে পারে। কিন্তু আর্কটিকের দীর্ঘ অন্ধকার শীত এলে সেই প্রতিফলন বদলে হয়ে যায় গভীর নীল।
সম্পূর্ণ পড়ুন
জাগুয়ার: যে বড় বিড়াল পানিকেও ভয় পায় না
বিড়ালজাতীয় প্রাণীর কথা ভাবলে পানিতে নেমে শিকার করার দৃশ্যটি হয়তো প্রথমে মাথায় আসে না। কিন্তু মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার জাগুয়ার (Panthera onca) এই ধারণাটাই বদলে দেয়।
সম্পূর্ণ পড়ুন