৪৭ হাজার গাছ, অথচ একটি জীব!
কল্পনা করুন, আপনি একটি বিশাল বনের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন।
লেখক: পৃথিবীনামা

কল্পনা করুন, আপনি একটি বিশাল বনের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন।
চারদিকে হাজার হাজার গাছ। প্রতিটির আলাদা কাণ্ড, আলাদা ডালপালা, আলাদা পাতা। শরতের আলোয় পুরো বন যেন সোনালি রঙে ঢেকে গেছে।
স্বাভাবিকভাবেই আপনার মনে হবে, এখানে হাজার হাজার আলাদা গাছ রয়েছে।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা যদি বলেন, এই পুরো বন আসলে একটি মাত্র জীবের অংশ?
শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও যুক্তরাষ্ট্রে সত্যিই এমন একটি বন রয়েছে!
এর নাম Pando Aspen Clone, সংক্ষেপে পান্ডো (Pando)।
যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের ফিশলেক ন্যাশনাল ফরেস্টে অবস্থিত এই অদ্ভুত বনটি প্রকৃতির অন্যতম বিস্ময়কর জীবন্ত নিদর্শন। হাজার হাজার গাছ কীভাবে একটি জীব হয়?
পান্ডো মূলত Quaking Aspen প্রজাতির গাছ দিয়ে গঠিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Populus tremuloides।
এই গাছগুলোর একটি বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে।
এরা শুধু বীজ থেকে নতুন গাছ তৈরি করে না। মাটির নিচে ছড়িয়ে থাকা শিকড় থেকেও নতুন কাণ্ড জন্মাতে পারে।
একটি গাছের শিকড় থেকে নতুন অঙ্কুর বের হয়। সেই অঙ্কুর বড় হয়ে আরেকটি গাছের মতো দাঁড়িয়ে যায়।
এরপর একই প্রক্রিয়া বারবার ঘটতে থাকে।
ফলে ধীরে ধীরে তৈরি হয় বিশাল একটি বন।
কিন্তু এই বনের কাণ্ডগুলো একই মূল উদ্ভিদের বংশবিস্তারের অংশ।
বিজ্ঞানীরা একে বলেন Clonal Colony।
২০০৮ সালে প্রকাশিত একটি জিনগত গবেষণায় পান্ডোর বিভিন্ন অংশ থেকে ২০৯টি কাণ্ডের নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণায় নিশ্চিত হয়, বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই কাণ্ডগুলো একই জিনগত জীবের অংশ।
কত বড় এই একটি জীব? NASA-র তথ্য অনুযায়ী, পান্ডো প্রায় ১০৬ একর, অর্থাৎ প্রায় ৪৩ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত।
এখানে রয়েছে ৪০ হাজারেরও বেশি কাণ্ড। প্রচলিত বৈজ্ঞানিক অনুমান অনুযায়ী সংখ্যাটি প্রায় ৪৭ হাজার।
আর পুরো জীবটির আনুমানিক ওজন প্রায় ৫,৯০০ মেট্রিক টন!
এই বিশাল আকারের কারণে পান্ডো পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী স্থলজ জীবগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।
তবে এটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীব বলা সব সংজ্ঞায় সঠিক নয়। কারণ কিছু ছত্রাক ও সামুদ্রিক উদ্ভিদের ক্লোনাল জনগোষ্ঠী আয়তনে আরও বড় হতে পারে।
কিন্তু গাছটি কত বছর ধরে বেঁচে আছে? এখানেই রয়েছে আরও একটি বিস্ময়।
পান্ডোর প্রতিটি দৃশ্যমান কাণ্ড হাজার হাজার বছরের পুরোনো নয়।
পুরোনো কাণ্ড মারা যায়। শিকড় থেকে আবার নতুন কাণ্ড জন্মায়।
এভাবেই মূল ক্লোনাল জীবটি দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে।
২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত একটি গবেষণার পর্যালোচিত প্রিপ্রিন্টে পান্ডোর বিভিন্ন অংশের জিনগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষকেরা অনুমান করেন, পান্ডোর বয়স প্রায় ১২ হাজার থেকে ৩৭ হাজার বছর হতে পারে!
তবে এটি নিশ্চিত বয়স নয়। গবেষণাটির পদ্ধতি ও তথ্যের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ পান্ডো ঠিক কত পুরোনো, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। eLife এত বড় জীবের অস্তিত্ব কি বিপদের মুখে? দুঃখজনকভাবে, হ্যাঁ।
পান্ডোর সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো নতুন কাণ্ডের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া।
এই অঞ্চলে হরিণসহ কিছু তৃণভোজী প্রাণী অ্যাসপেনের কচি অঙ্কুর খেয়ে ফেলে।
ফলে নতুন কাণ্ড অনেক সময় যথেষ্ট বড় হওয়ার সুযোগ পায় না।
অন্যদিকে পুরোনো কাণ্ডগুলো বয়সের কারণে মারা যেতে থাকে।
২০১৮ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, হরিণের অতিচারণ পান্ডোর পুনর্জন্মের জন্য বড় বাধা।
কিছু এলাকায় বেড়া দিয়ে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়ার পর নতুন অঙ্কুরের বৃদ্ধিতে উন্নতি দেখা গেছে।
অর্থাৎ হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকা এই বিশাল জীবটির ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে যথাযথ সংরক্ষণের ওপর।
প্রকৃতির এক অসাধারণ বিস্ময় আমরা সাধারণত একটি জীব বলতে একটি নির্দিষ্ট শরীর কল্পনা করি।
একটি হাতি, একটি পাখি কিংবা একটি গাছ।
কিন্তু পান্ডো আমাদের সেই ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
এখানে হাজার হাজার কাণ্ড রয়েছে, অথচ তারা একই ক্লোনাল জীবের অংশ।
প্রতিটি কাণ্ডের জীবন সীমিত হলেও মূল জীবটি নতুন কাণ্ড তৈরি করে টিকে থাকতে পারে হাজার হাজার বছর।
একটি বনের ভেতরে হাজার হাজার গাছ নয়, বরং হাজার হাজার কাণ্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল জীব!
প্রকৃতির বিস্ময় সবসময় দূরের কোনো গ্রহে লুকিয়ে থাকে না।
কখনো কখনো সেটি আমাদের পৃথিবীরই একটি সাধারণ দেখতে বনের মধ্যে অপেক্ষা করে।
উৎস ও আরও পড়ুন
গল্পটি শেয়ার করুন
এরপর পড়তে পারেন
এই গল্পের বিষয় ও সূত্র ধরে নির্বাচিত আরও পাঠ।

অ্যাক্সোলটল: শরীরের হারানো অংশ আবার গজাতে পারে যে প্রাণীর
ভাবুন, কোনো প্রাণীর একটি পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো কিন্তু ক্ষত শুকিয়ে শুধু দাগ পড়ে থাকার বদলে সেখানে আবার তৈরি হলো হাড়, পেশি, স্নায়ু ও ত্বকসহ কার্যকর একটি অঙ্গ।
সম্পূর্ণ পড়ুন
শীতে জমে গিয়েও বেঁচে থাকে যে ব্যাঙ!
কল্পনা করুন, প্রচণ্ড শীতের মধ্যে একটি ছোট ব্যাঙ পড়ে আছে বরফে ঢাকা বনের মাটিতে।
সম্পূর্ণ পড়ুন
মানুষকে মৌচাক দেখিয়ে দেয় যে পাখি!
আফ্রিকার গভীর বনাঞ্চলে একজন মানুষ মধু খুঁজতে বেরিয়েছেন। কিন্তু তিনি একা নন। তাঁর সঙ্গী একটি ছোট বুনো পাখি, যে গাছ থেকে গাছে উড়ে তাঁকে পথ দেখাচ্ছে।
সম্পূর্ণ পড়ুন