সাইবেরিয়ার আকাশে কী বিস্ফোরিত হয়েছিল?
১৯০৮ সালের ৩০ জুন। রাশিয়ার সাইবেরিয়ার দুর্গম বনাঞ্চলে তখন সকাল। হঠাৎ আকাশে দেখা গেল এক উজ্জ্বল আগুনের গোলা। মুহূর্তের মধ্যে সেটি ভয়ংকর বিস্ফোরণে পরিণত হলো।
লেখক: পৃথিবীনামা

১৯০৮ সালের ৩০ জুন। রাশিয়ার সাইবেরিয়ার দুর্গম বনাঞ্চলে তখন সকাল। হঠাৎ আকাশে দেখা গেল এক উজ্জ্বল আগুনের গোলা। মুহূর্তের মধ্যে সেটি ভয়ংকর বিস্ফোরণে পরিণত হলো।
প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ। বিস্ফোরণের ধাক্কায় ভেঙে পড়ল অসংখ্য গাছ। দূরের মানুষেরাও অনুভব করলেন সেই কম্পন।
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এত বড় বিস্ফোরণের পরও সেখানে কোনো বিশাল উল্কাপিণ্ডের গর্ত পাওয়া যায়নি!
ঘটনাটি ইতিহাসে পরিচিত Tunguska Event নামে।
সেদিন আসলে কী ঘটেছিল?
সাইবেরিয়ার Podkamennaya Tunguska নদীর কাছে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে প্রায় ২,০০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে বহু কিলোমিটার দূর পর্যন্ত গাছগুলো মাটিতে শুয়ে পড়ে। অথচ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন কোনো বড় গর্ত খুঁজে পাননি, যা সাধারণত বিশাল উল্কাপিণ্ড মাটিতে আঘাত করলে তৈরি হওয়ার কথা।
রহস্য আরও গভীর হলো ১৯২৭ সালে বিস্ফোরণের প্রায় ১৯ বছর পর, ১৯২৭ সালে রুশ বিজ্ঞানী Leonid Kulik-এর নেতৃত্বে প্রথম বৈজ্ঞানিক
অভিযান ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
গবেষকেরা সেখানে গিয়ে বিস্মিত হন।
চারদিকে হাজার হাজার গাছ মাটিতে পড়ে আছে। অনেক গাছ বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ার মতোভাবে উপড়ে গেছে।
কিন্তু কেন্দ্রের কাছাকাছি কিছু গাছ দাঁড়িয়ে ছিল, যদিও তাদের ডালপালা ভেঙে গিয়েছিল। এমন অদ্ভুত ধ্বংসের চিহ্ন তৈরি হলো কীভাবে? American Physical Society বিজ্ঞানীরা কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন?
আজ অধিকাংশ বিজ্ঞানীর মতে, সেদিন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল একটি মহাজাগতিক বস্তু, সম্ভবত ছোট একটি গ্রহাণু।
প্রচণ্ড গতিতে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার সময় বস্তুটির ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়। একপর্যায়ে এটি মাটিতে পৌঁছানোর আগেই আকাশে ভেঙে বিস্ফোরিত হয়।
এই ধরনের ঘটনাকে বলা হয় Airburst।
বিস্ফোরণের ফলে তৈরি হওয়া শক্তিশালী shockwave নিচের বনভূমিতে আঘাত করে এবং বিশাল এলাকাজুড়ে গাছপালা ধ্বংস করে।
NASA-র গবেষণা অনুযায়ী, বিস্ফোরণটি মাটির কয়েক কিলোমিটার ওপরে ঘটেছিল। বিভিন্ন গবেষণায় এর শক্তি ও উচ্চতার হিসাব কিছুটা ভিন্ন পাওয়া যায়। NASA তাহলে এত বড় বিস্ফোরণের গর্ত নেই কেন?
কারণ সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মহাজাগতিক বস্তুটি মাটিতে আঘাত করার আগেই বায়ুমণ্ডলে ভেঙে যায়।
এর ফলে বিপুল শক্তি বাতাসেই মুক্তি পায়। সেই শক্তির ধাক্কা মাটিতে পৌঁছালেও কোনো বিশাল কঠিন বস্তু সরাসরি মাটিতে আঘাত করেনি। তাই বড় কোনো impact crater তৈরি হয়নি। তবে বস্তুটির নির্দিষ্ট আকার, গঠন এবং সম্ভাব্য অবশিষ্টাংশ নিয়ে গবেষণায় এখনও কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কেন ঘটনাটি আজও গুরুত্বপূর্ণ?
তুঙ্গুস্কার বিস্ফোরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহাকাশ থেকে আসা কোনো বস্তু পৃথিবীর মাটিতে আঘাত না করেও বিশাল ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে।
২০১৩ সালে রাশিয়ার Chelyabinsk অঞ্চলেও একটি ছোট গ্রহাণু বায়ুমণ্ডলে বিস্ফোরিত হয়েছিল। সেই ঘটনার পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানীদের তুঙ্গুস্কার মতো অতীতের বিস্ফোরণ বুঝতে সাহায্য করেছে। আজ NASA এবং অন্যান্য মহাকাশ সংস্থা পৃথিবীর কাছাকাছি আসা গ্রহাণু শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের জন্য গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।
এক শতাব্দীরও বেশি আগে সাইবেরিয়ার আকাশে ঘটে যাওয়া সেই বিস্ফোরণের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখন আমাদের জানা।
তবুও ঘটনাটির সব খুঁটিনাটি এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
আর এই ঘটনাই প্রমাণ করে, মহাকাশের কোনো ছোট বস্তু কখনো কখনো পৃথিবীতে কত বড় প্রভাব ফেলতে পারে!
উৎস ও আরও পড়ুন
গল্পটি শেয়ার করুন
এরপর পড়তে পারেন
এই গল্পের বিষয় ও সূত্র ধরে নির্বাচিত আরও পাঠ।

মানুষগুলো কোথায় গেল? মেরি সেলেস্টের অমীমাংসিত রহস্য
১৮৭২ সালের ডিসেম্বর। আটলান্টিকের মাঝখানে একটি জাহাজকে অস্বাভাবিকভাবে ভেসে যেতে দেখে কাছাকাছি থাকা Dei Gratia নামের আরেকটি জাহাজ।
সম্পূর্ণ পড়ুন
যে বইয়ের ভাষা আজও কেউ পড়তে পারেনি
একটি পুরোনো বই। পাতায় পাতায় অচেনা গাছপালা, নক্ষত্র ও রাশিচক্রের মতো চিত্র, রহস্যময় বৃত্তাকার নকশা, অদ্ভুত জলাধারে মানুষের ছবি। আর সবকিছুর পাশে লেখা এমন এক লিপি, যার অর্থ আজও নিশ্চিতভাবে কেউ উদ্ধার করত
সম্পূর্ণ পড়ুন
১৯৫৯ সালের সেই রাতে ডায়াটলভ পাসে আসলে কী ঘটেছিল?
১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারি। সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তর উরাল পর্বতমালায় কঠিন এক শীতকালীন অভিযানে বেরিয়েছিলেন অভিজ্ঞ তরুণ পর্বতারোহীদের একটি দল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন ইগর ডায়াটলভ। অভিযানটি আর শেষ হয়নি। দলের একজন
সম্পূর্ণ পড়ুন