যে নদী সাগরে পৌঁছায় না, শুষ্ক মৌসুমে জাগিয়ে তোলে জলাভূমি!
কল্পনা করুন, চারদিকে শুষ্ক ভূমি। দীর্ঘদিন বৃষ্টি নেই। ঘাস শুকিয়ে যাচ্ছে, নদী-নালা থেকে পানি কমে আসছে।
লেখক: পৃথিবীনামা

কল্পনা করুন, চারদিকে শুষ্ক ভূমি। দীর্ঘদিন বৃষ্টি নেই। ঘাস শুকিয়ে যাচ্ছে, নদী-নালা থেকে পানি কমে আসছে।
ঠিক এমন সময় দূর থেকে আসতে শুরু করল বিপুল পরিমাণ পানি!
ধীরে ধীরে শুকনো তৃণভূমি ভরে উঠল পানিতে। তৈরি হলো অসংখ্য ছোট নদী, জলাশয় আর সবুজ দ্বীপ।
আর সেই পানির টানে ছুটে আসতে লাগল হাতি, মহিষ, হরিণ ও অসংখ্য পাখি।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, আফ্রিকায় এমন একটি জায়গা রয়েছে, যেখানে স্থানীয় শুষ্ক মৌসুমেই সবচেয়ে বড় বন্যা আসে!
জায়গাটির নাম Okavango Delta, বাংলায় ওকাভাঙ্গো বদ্বীপ।
আফ্রিকার বতসোয়ানার উত্তর-পশ্চিমে, কালাহারি অববাহিকার মধ্যে অবস্থিত এই বিশাল জলাভূমি পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ব্যবস্থার উদাহরণ।
কিন্তু এর সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, যে নদী এই বদ্বীপ তৈরি করেছে, সেটি কোনো সাগর বা মহাসাগরে গিয়ে মেশে না!
তাহলে নদীর পানি কোথায় যায়?
সাধারণত বড় নদীগুলো পাহাড় বা উঁচু ভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত সাগরে মেশে।
কিন্তু ওকাভাঙ্গো নদীর গল্প আলাদা।
নদীটির উৎস Angola-র উঁচুভূমিতে। সেখান থেকে পানি দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে নামিবিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চল অতিক্রম করে বতসোয়ানায় প্রবেশ করে।
এরপর নদীটি অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে বিস্তৃত সমতল ভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে।
এভাবেই তৈরি হয় বিশাল ওকাভাঙ্গো বদ্বীপ।
কিন্তু এই পানি আর সাগরে পৌঁছায় না।
পানির একটি বড় অংশ বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে ফিরে যায়। কিছু পানি উদ্ভিদের মাধ্যমে বাষ্পমোচনের প্রক্রিয়ায় হারিয়ে যায়, আর কিছু মাটির নিচে শোষিত হয়।
ভূগোলের ভাষায় এ ধরনের জলনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে বলা হয় Endorheic Basin, অর্থাৎ এমন একটি অববাহিকা যার পানি সাধারণভাবে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে না। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে বন্যা আসে কেন? এখানেই প্রকৃতির সবচেয়ে চমৎকার কৌশলটি লুকিয়ে আছে।
বতসোয়ানায় যখন শুষ্ক মৌসুম, তখন অনেক দূরে অ্যাঙ্গোলার উঁচুভূমিতে কয়েক মাস আগে বর্ষার বৃষ্টি হয়ে গেছে।
সেই বৃষ্টির পানি ওকাভাঙ্গো নদী দিয়ে ধীরে ধীরে দক্ষিণে নামতে থাকে।
কিন্তু নদীপথের ঢাল অত্যন্ত কম হওয়ায় পানির এই যাত্রা দ্রুত শেষ হয় না।
বন্যার পানি বদ্বীপের বিভিন্ন অংশে পৌঁছাতে কয়েক মাস সময় লাগে।
ফলে অ্যাঙ্গোলার বর্ষাকালের পানি বতসোয়ানার জলাভূমিতে এসে পৌঁছায় ঠিক তখন, যখন স্থানীয়ভাবে বৃষ্টি প্রায় বন্ধ!
সাধারণত জুন থেকে আগস্টের দিকে বদ্বীপের অনেক অঞ্চলে পানির বিস্তার সবচেয়ে বেশি হয়। তবে সুনির্দিষ্ট সময় ও বন্যার পরিমাণ বছরভেদে পরিবর্তিত হয়।
অর্থাৎ এক দেশের বর্ষার পানি অন্য দেশের শুষ্ক মৌসুমে এসে বন্যা তৈরি করে! এই বন্যাই হাজার হাজার প্রাণীর জীবন বাঁচায় কালাহারি অঞ্চলের বিস্তীর্ণ ভূমিতে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব দেখা দিতে পারে।
কিন্তু ঠিক সেই সময় ওকাভাঙ্গো বদ্বীপে পানির বিস্তার বাড়তে থাকে।
নতুন জলাশয় তৈরি হয়। শুকনো তৃণভূমি ভিজে ওঠে। জলজ উদ্ভিদ বেড়ে ওঠে।
এই পরিবর্তন বন্যপ্রাণীদের জন্য তৈরি করে গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়।
হাতির পাল পানির সন্ধানে এখানে আসে। মহিষ ও বিভিন্ন অ্যান্টিলোপ জলাভূমির আশপাশে বিচরণ করে। অসংখ্য জলচর পাখি এই পরিবেশে খাদ্য ও আশ্রয় পায়।
শিকারি প্রাণীরাও এই সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্রের অংশ।
ওকাভাঙ্গো বদ্বীপ তাই শুধু একটি নদীর শেষ গন্তব্য নয়, বরং আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল।
মহাকাশ থেকেও দেখা যায় এই পরিবর্তন NASA-র উপগ্রহ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কালাহারি অঞ্চলের আশপাশের ভূমি শুষ্ক মৌসুমে বাদামি হয়ে গেলেও ওকাভাঙ্গো বদ্বীপের বিস্তীর্ণ অংশ সবুজ থাকে।
আবার ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ESA-র Sentinel-1 রাডার পর্যবেক্ষণে বদ্বীপের জলাবদ্ধ ভূমির মৌসুমি পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়েছে।
অর্থাৎ প্রতি বছর মহাকাশ থেকেও দেখা যায়, কীভাবে পানির আগমনে বদলে যাচ্ছে বিশাল একটি ভূখণ্ড।
পৃথিবীর এক অনন্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ওকাভাঙ্গো বদ্বীপের এই অসাধারণ বৈশিষ্ট্যের কারণে ২০১৪ সালে UNESCO এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এটি ছিল UNESCO World Heritage List-এ অন্তর্ভুক্ত এক হাজারতম স্থান।
তবে এই জলাভূমির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নদীর উজানের পানিপ্রবাহ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের ওপর।
কারণ দূরবর্তী অ্যাঙ্গোলার উঁচুভূমিতে যা ঘটছে, তার প্রভাব কয়েক মাস পরে বতসোয়ানার অসংখ্য প্রাণীর জীবনে পৌঁছে যায়।
একটি নদী সাগরে পৌঁছায় না। অথচ সেই নদীর পানিই শুষ্ক ভূমির মধ্যে তৈরি করে জীবনের বিশাল আশ্রয়।
প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর বিস্ময়গুলো কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে এমন অদ্ভুত ভৌগোলিক সম্পর্কের মধ্যেই।
উৎস ও আরও পড়ুন
গল্পটি শেয়ার করুন
এরপর পড়তে পারেন
এই গল্পের বিষয় ও সূত্র ধরে নির্বাচিত আরও পাঠ।

পৃথিবীর ভূত্বক যেখানে ধীরে ধীরে ছিঁড়ে যাচ্ছে
ইথিওপিয়ার Danakil Depression-এ ভূত্বকের তিনটি বড় অংশ দূরে সরে যাচ্ছে। রঙিন জলাধার ও আগ্নেয়গিরির আড়ালে চলছে পৃথিবীর ভূমি বদলে যাওয়ার প্রক্রিয়া।
সম্পূর্ণ পড়ুন
ডেথ ভ্যালির পাথরগুলো নিজেরাই চলত কীভাবে?
যুক্তরাষ্ট্রের Death Valley National Park-এর Racetrack Playa। বিশাল সমতল শুকনো হ্রদের বুকে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য পাথর। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার পাথরগুলো নয়, তাদের পেছনে মাটির ওপর তৈরি হওয়া লম্বা আঁকাবা
সম্পূর্ণ পড়ুন
যে হ্রদ হঠাৎ প্রাণঘাতী গ্যাসের মেঘ ছেড়েছিল
১৯৮৬ সালের ২১ আগস্ট। ক্যামেরুনের পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত শান্ত একটি আগ্নেয় হ্রদ, Lake Nyos। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে হ্রদটির গভীর পানিতে দীর্ঘদিন ধরে জমছিল বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড।
সম্পূর্ণ পড়ুন