যে হ্রদ হঠাৎ প্রাণঘাতী গ্যাসের মেঘ ছেড়েছিল
১৯৮৬ সালের ২১ আগস্ট। ক্যামেরুনের পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত শান্ত একটি আগ্নেয় হ্রদ, Lake Nyos। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে হ্রদটির গভীর পানিতে দীর্ঘদিন ধরে জমছিল বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড।
লেখক: পৃথিবীনামা

১৯৮৬ সালের ২১ আগস্ট। ক্যামেরুনের পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত শান্ত একটি আগ্নেয় হ্রদ, Lake Nyos। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে হ্রদটির গভীর পানিতে দীর্ঘদিন ধরে জমছিল বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড।
সেদিন হঠাৎ সেই গ্যাসের একটি বিশাল অংশ পানি থেকে বেরিয়ে আসে। তৈরি হয় ঘন CO₂-এর মেঘ, যা আশপাশের নিচু উপত্যকা ও গ্রামগুলোর দিকে নেমে যায়। এই ঘটনায় অন্তত ১,৭০০ মানুষ এবং হাজার হাজার গবাদিপশু মারা যায়।
কিন্তু একটি হ্রদে এত কার্বন ডাই-অক্সাইড এলো কোথা থেকে?
Lake Nyos আসলে একটি maar crater lake, অর্থাৎ আগ্নেয় বিস্ফোরণে তৈরি গর্তে গড়ে ওঠা হ্রদ। ভূগর্ভের magmatic উৎস থেকে CO₂ ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে হ্রদের গভীর পানিতে প্রবেশ করত। প্রচণ্ড পানির চাপের কারণে গভীরে এই গ্যাস অনেকটা বন্ধ সোডার বোতলের মতো পানির মধ্যে দ্রবীভূত অবস্থায় জমতে পেরেছিল।
সমস্যা শুরু হয় যখন গভীরের CO₂-সমৃদ্ধ পানি উপরের দিকে উঠতে শুরু করে।
চাপ কমার সঙ্গে সঙ্গে দ্রবীভূত CO₂ বুদবুদ হয়ে বেরিয়ে আসে। এতে পানি আরও দ্রুত ওপরে ওঠে এবং আরও গ্যাস মুক্ত হয়। এক পর্যায়ে প্রক্রিয়াটি নিজেই দ্রুততর হয়ে বিপুল পরিমাণ CO₂ বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে দেয়। এ ধরনের বিরল ঘটনাকে সাধারণভাবে limnic eruption বলা হয়। ১৯৮৬ সালের Lake Nyos ঘটনার ঠিক কোন প্রাথমিক কারণ এই প্রক্রিয়াটি শুরু করেছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসের চেয়ে ঘন। তাই মুক্ত হওয়ার পর গ্যাসটি শুধু ওপরে উঠে ছড়িয়ে যায়নি। এটি ভূমির নিচু অংশ ধরে উপত্যকার দিকে প্রবাহিত হয়েছিল। সেখানে উচ্চমাত্রার CO₂ বাতাসের অক্সিজেনকে সরিয়ে দিয়ে শ্বাস নেওয়ার মতো পরিবেশ নষ্ট করে দেয়।
বিপর্যয়ের পর বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, শুধু হ্রদটি পর্যবেক্ষণ করলেই যথেষ্ট নয়। গভীরে আবার CO₂ জমতে থাকলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই ২০০১ সালে Lake Nyos-এ controlled degassing শুরু হয়। লম্বা পাইপের মাধ্যমে হ্রদের গভীরের gas-rich পানি ওপরে আনা হয়। চাপ কমতেই CO₂ বেরিয়ে আসে এবং সেই গ্যাসের শক্তিই পানিকে পাইপ দিয়ে ওপরে তুলতে সাহায্য করে। এর ফলে হ্রদের গভীরে জমে থাকা CO₂ ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রিতভাবে সরানো সম্ভব হয়েছে।
Lake Nyos-এর ঘটনা দেখিয়েছিল, দেখতে সম্পূর্ণ শান্ত একটি হ্রদের গভীরেও এমন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া চলতে পারে যার কোনো দৃশ্যমান সতর্কসংকেত উপরে থেকে সহজে বোঝা যায় না।
পৃথিবীর রহস্য সবসময় দূর মহাকাশে বা গভীর সমুদ্রে লুকিয়ে থাকে না। কখনও কখনও তা লুকিয়ে থাকে একটি শান্ত পাহাড়ি হ্রদের কয়েকশ মিটার নিচে।
উৎস ও আরও পড়ুন
গল্পটি শেয়ার করুন
এরপর পড়তে পারেন
এই গল্পের বিষয় ও সূত্র ধরে নির্বাচিত আরও পাঠ।

ডেথ ভ্যালির পাথরগুলো নিজেরাই চলত কীভাবে?
যুক্তরাষ্ট্রের Death Valley National Park-এর Racetrack Playa। বিশাল সমতল শুকনো হ্রদের বুকে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য পাথর। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার পাথরগুলো নয়, তাদের পেছনে মাটির ওপর তৈরি হওয়া লম্বা আঁকাবা
সম্পূর্ণ পড়ুন
হিমালয়: যে পর্বতমালার জন্ম হয়েছিল দুই মহাদেশের সংঘর্ষে!
পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয়কে আমরা আজ স্থির ও অটল মনে করি। কিন্তু এর জন্মের গল্পটা আসলে কোটি কোটি বছর ধরে চলা পৃথিবীর এক বিশাল ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের গল্প।
সম্পূর্ণ পড়ুন
যে নদী সাগরে পৌঁছায় না, শুষ্ক মৌসুমে জাগিয়ে তোলে জলাভূমি!
কল্পনা করুন, চারদিকে শুষ্ক ভূমি। দীর্ঘদিন বৃষ্টি নেই। ঘাস শুকিয়ে যাচ্ছে, নদী-নালা থেকে পানি কমে আসছে।
সম্পূর্ণ পড়ুন