অজানা জগৎপ্রায় ৪ মিনিটের পাঠ

যে গাছের রস রক্তের মতো লাল!

কল্পনা করুন, আপনি এমন একটি দ্বীপে পৌঁছেছেন, যেখানে পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য অদ্ভুত আকৃতির গাছ।

লেখক: পৃথিবীনামা

Socotra DragonBloodTree অজানাপৃথিবী NatureWonders Biodiversitydragon blood tree red resin Socotra DragonBloodTree অজানাপৃথিবী NatureWonders Biodiversity
যে গাছের রস রক্তের মতো লাল! — নিবন্ধের চিত্র

কল্পনা করুন, আপনি এমন একটি দ্বীপে পৌঁছেছেন, যেখানে পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য অদ্ভুত আকৃতির গাছ।

দূর থেকে দেখলে মনে হবে, বিশাল সব ছাতা মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে!

গাছগুলোর মোটা কাণ্ড থেকে অসংখ্য শাখা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আর শাখাগুলোর মাথায় রয়েছে ঘন সবুজ পাতার ছাউনি।

কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়টি লুকিয়ে আছে গাছের ভেতরে।

এই গাছের বাকল ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে রক্তের মতো গাঢ় লাল রজন!

এটি কোনো কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়।

পৃথিবীতেই রয়েছে এমন এক আশ্চর্য গাছ, যার নাম Dragon’s Blood Tree, বাংলায় ড্রাগনস ব্লাড ট্রি।

এর বৈজ্ঞানিক নাম Dracaena cinnabari।

আর এই অদ্ভুত গাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হলো সোকোত্রা দ্বীপ, ভারত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ইয়েমেনের একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।

গাছের ভেতরে সত্যিই কি রক্ত আছে? না। গাছটির ভেতরে কোনো প্রাণীর রক্ত নেই।

এর বাকল বা কাণ্ডে আঘাত লাগলে যে লাল পদার্থ বেরিয়ে আসে, সেটি আসলে একধরনের প্রাকৃতিক রজন।

এই রজনের গাঢ় লাল রঙের কারণেই গাছটির নাম হয়েছে Dragon’s Blood Tree।

প্রাচীনকাল থেকে মানুষ এই রজন রং তৈরির কাজে ব্যবহার করেছে। ঐতিহ্যগত চিকিৎসাতেও এর ব্যবহার ছিল।

তবে ঐতিহ্যগত ব্যবহার থাকলেই কোনো পদার্থের চিকিৎসাগত কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয় না।

গাছটির নামের পেছনে রয়েছে লোককথাও। কিন্তু এর লাল রজনের উৎপত্তি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক।

গাছগুলো দেখতে ছাতার মতো কেন?

এখানেই লুকিয়ে আছে প্রকৃতির এক অসাধারণ অভিযোজন।

সোকোত্রার অনেক অঞ্চল শুষ্ক ও পাথুরে। সেখানে পানির প্রাপ্যতা সবসময় পর্যাপ্ত নয়।

তাই ড্রাগনস ব্লাড ট্রি এমন এক গঠন তৈরি করেছে, যা পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণে সাহায্য করে।

এর ঘন ছাতার মতো পাতার মুকুট বাতাসে ভেসে আসা কুয়াশার ক্ষুদ্র জলকণা আটকে রাখতে পারে।

সেই জলকণা পাতার ওপর জমে বড় ফোঁটায় পরিণত হয়। পরে নিচের মাটিতে ঝরে পড়ে।

পাশাপাশি ঘন ছাউনি গাছের নিচের মাটিকে সরাসরি রোদ থেকে কিছুটা আড়াল করে।

ফলে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতেও সাহায্য হয়।

অর্থাৎ গাছটির অদ্ভুত আকৃতি শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল!

কুয়াশা থেকেও পানি সংগ্রহ করে এই গাছ!

২০২০ সালে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সোকোত্রার ড্রাগনস ব্লাড ট্রির বনভূমি কীভাবে কুয়াশা থেকে পানি সংগ্রহ করে, তা বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষকেরা দেখতে পান, বিশেষ করে উঁচু অঞ্চলে কুয়াশা থেকে পাওয়া পানি স্থানীয় জলচক্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

তাঁদের মডেল অনুযায়ী, কিছু অঞ্চলে এই অতিরিক্ত পানির পরিমাণ মোট বার্ষিক জলপ্রাপ্তির ৪০ শতাংশেরও বেশি হতে পারে।

অর্থাৎ এই গাছগুলো শুধু নিজের জন্য পানি সংগ্রহ করে না, আশপাশের পরিবেশের আর্দ্রতা বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

পৃথিবীর আর কোথায় পাওয়া যায় এই গাছ? Dracaena cinnabari প্রজাতিটি প্রাকৃতিকভাবে সোকোত্রার নিজস্ব উদ্ভিদ।

বিজ্ঞানীরা এমন প্রজাতিকে বলেন Endemic Species।

দীর্ঘ ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে সোকোত্রায় এমন অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিবর্তন ঘটেছে, যাদের পৃথিবীর অন্য কোথাও প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় না।

UNESCO-র তথ্য অনুযায়ী, সোকোত্রা দ্বীপপুঞ্জের ৮২৫টি নথিভুক্ত উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশই স্থানীয়।

এই অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের কারণে ২০০৮ সালে সোকোত্রা দ্বীপপুঞ্জকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

কিন্তু এই অদ্ভুত গাছগুলো কি নিরাপদ? দুঃখজনকভাবে, পুরোপুরি নয়।

ড্রাগনস ব্লাড ট্রি বর্তমানে IUCN-এর মূল্যায়নে Vulnerable, অর্থাৎ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রজাতি।

গাছটি খুব ধীরে বৃদ্ধি পায়।

অনেক অঞ্চলে ছাগলসহ গৃহপালিত প্রাণীর অতিচারণের কারণে নতুন চারাগাছ বড় হওয়ার আগেই নষ্ট হয়ে যায়।

জলবায়ু পরিবর্তন ও আবাসস্থলের অবক্ষয়ও এর ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের কারণ।

২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, সোকোত্রার বিভিন্ন ড্রাগনস ব্লাড ট্রি জনগোষ্ঠীতে নতুন গাছের স্বাভাবিক পুনর্জন্মের হার উদ্বেগজনকভাবে কম।

ফলে পুরোনো গাছগুলো ধীরে ধীরে মারা গেলে তাদের জায়গায় পর্যাপ্ত নতুন গাছ জন্মাচ্ছে না।

প্রকৃতির এক জীবন্ত বিস্ময় সোকোত্রার ড্রাগনস ব্লাড ট্রি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর প্রতিটি পরিবেশেই জীবন টিকে থাকার নিজস্ব কৌশল তৈরি করেছে।

কোথাও প্রাণীরা রং বদলায়, কোথাও উদ্ভিদ পানি জমিয়ে রাখে।

আর সোকোত্রায় একটি গাছ ছাতার মতো আকৃতি তৈরি করে কুয়াশা থেকে পানি সংগ্রহ করে।

তার শরীরে রয়েছে রক্তের মতো লাল রজন।

তার ছায়ায় আশ্রয় পায় অন্য প্রাণী।

দূর থেকে দেখলে মনে হয় অন্য কোনো গ্রহের গাছ। অথচ এটি আমাদের পৃথিবীরই এক অসাধারণ সৃষ্টি!

উৎস ও আরও পড়ুন

  1. https://stories.rbge.org.uk/archives/25866
  2. https://powo.science.kew.org/taxon/urn%3Alsid%3Aipni.org%3Anames%3A534145-1
  3. https://whc.unesco.org/en/list/1263

গল্পটি শেয়ার করুন

এই গল্পের বিষয় ও সূত্র ধরে নির্বাচিত আরও পাঠ।

সব গল্প দেখুন
গুহার ভেতর ১১ মিটার লম্বা স্ফটিক! — নিবন্ধের চিত্র
অজানা জগৎ১৪ অক্টো, ২০২৬প্রায় ৩ মিনিট

গুহার ভেতর ১১ মিটার লম্বা স্ফটিক!

কল্পনা করুন, মাটির প্রায় ৩০০ মিটার নিচে এমন একটি গুহা, যেখানে চারদিকে ছড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল স্বচ্ছ স্ফটিক। কোনোটি মাটি থেকে উঠে গেছে অনেক ওপরে, আবার কোনোটি দেয়াল ভেদ করে আড়াআড়িভাবে বিস্তৃত।

সম্পূর্ণ পড়ুন
সূর্যের আলো ছাড়াই টিকে থাকা এক গোপন জগৎ — নিবন্ধের চিত্র
অজানা জগৎ১ অক্টো, ২০২৬প্রায় ২ মিনিট

সূর্যের আলো ছাড়াই টিকে থাকা এক গোপন জগৎ

পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি পরিচিত খাদ্যজালের শুরুতে কোনো না কোনোভাবে সূর্যের ভূমিকা থাকে। গাছ বা শৈবাল সূর্যের আলো ব্যবহার করে photosynthesis করে, তারপর সেই শক্তিই ছড়িয়ে পড়ে অন্য প্রাণীদের মধ্যে। কিন্তু রো

সম্পূর্ণ পড়ুন
সোকোত্রা দ্বীপ: পৃথিবীতেই যেন অন্য এক জগত — নিবন্ধের চিত্র
ভূগোল৪ সেপ, ২০২৬প্রায় ২ মিনিট

সোকোত্রা দ্বীপ: পৃথিবীতেই যেন অন্য এক জগত

ভাবুন এমন একটি দ্বীপের কথা, যেখানে ছাতার মতো অদ্ভুত গাছ, বিচ্ছিন্ন ভূদৃশ্য আর এমন সব উদ্ভিদ-প্রাণী আছে, যেগুলোর অনেকগুলো পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। ইয়েমেনের Socotra Archipelago ঠিক তেমনই এক বিস্ময়ক

সম্পূর্ণ পড়ুন