প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীপ্রায় ৩ মিনিটের পাঠ

৯ কোটি বছর আগে অ্যান্টার্কটিকায় ছিল সবুজ বন!

কল্পনা করুন, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন অ্যান্টার্কটিকায়।

লেখক: পৃথিবীনামা

প্রাগৈতিহাসিকপৃথিবী Antarctica CretaceousPeriod Paleoclimate প্রকৃতিরবিস্ময়antarctica cretaceous rainforest প্রাগৈতিহাসিকপৃথিবী Antarctica CretaceousPeriod Paleoclimate প্রকৃতিরবিস্ময়
৯ কোটি বছর আগে অ্যান্টার্কটিকায় ছিল সবুজ বন! — নিবন্ধের চিত্র

কল্পনা করুন, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন অ্যান্টার্কটিকায়।

চারদিকে বরফের বিশাল চাদর নেই। নেই তুষারে ঢাকা নির্জন প্রান্তর।

বরং আপনার সামনে বিস্তৃত সবুজ বন। উঁচু গাছ, ফার্ন, জলাভূমি আর অসংখ্য উদ্ভিদে ভরা এক প্রাচীন পৃথিবী।

অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে?

অথচ প্রায় ৯ কোটি বছর আগে অ্যান্টার্কটিকার কিছু অংশ সত্যিই এমন ছিল!

আর বিজ্ঞানীরা এই বিস্ময়কর তথ্যের প্রমাণ পেয়েছেন সমুদ্রের তলদেশ থেকে।

বরফের মহাদেশে প্রাচীন বনের সন্ধান ২০১৭ সালে গবেষকেরা পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার Amundsen Sea অঞ্চলে সমুদ্রতলের নিচ থেকে একটি দীর্ঘ পলির নমুনা সংগ্রহ করেন।

প্রথমে সেটিকে সাধারণ ভূতাত্ত্বিক নমুনা মনে হলেও পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তাঁরা অবাক হয়ে যান।

পলির ভেতরে পাওয়া যায় অসংখ্য প্রাচীন গাছের শিকড়ের চিহ্ন!

শুধু শিকড় নয়, সেখানে ছিল পরাগরেণু, উদ্ভিদের স্পোর এবং অন্যান্য জৈব উপাদান।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রায় তিন মিটার দীর্ঘ একটি স্তরে শিকড়ের জাল এমনভাবে সংরক্ষিত ছিল, যা প্রমাণ করে একসময় সেখানেই উদ্ভিদ জন্মাত।

অর্থাৎ এগুলো দূর থেকে ভেসে আসা গাছের অবশিষ্টাংশ নয়। এটি ছিল প্রাচীন একটি বনভূমির মাটি।

কত পুরোনো ছিল সেই বন?

গবেষণায় দেখা যায়, নমুনাটি প্রায় ৯ কোটি বছর আগের, অর্থাৎ Cretaceous Period বা ক্রিটেশিয়াস যুগের।

এই যুগে পৃথিবীতে ডাইনোসরদের বিচরণ ছিল।

২০২০ সালের ১ এপ্রিল বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী Nature-এ প্রকাশিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানান, প্রায় ৯ কোটি বছর আগে দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকায় নাতিশীতোষ্ণ, জলাভূমিসমৃদ্ধ বন ছিল।

গবেষণায় শনাক্ত করা প্রাচীন পরিবেশটির অবস্থান ছিল প্রায় ৮২ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশে।

আজকের পৃথিবীতে এমন অবস্থানে আমরা বরফাচ্ছাদিত পরিবেশের কথা ভাবি।

কিন্তু সেই সময়ের পৃথিবী ছিল অনেকটাই আলাদা। তখন অ্যান্টার্কটিকায় কতটা গরম ছিল?

গবেষকেরা জীবাশ্ম, পরাগরেণু এবং পলির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে প্রাচীন জলবায়ুর একটি চিত্র তৈরি করেন।

তাঁদের অনুমান অনুযায়ী, সেই অঞ্চলের গড় বার্ষিক তাপমাত্রা ছিল প্রায় ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

গ্রীষ্মকালে গড় তাপমাত্রা পৌঁছাত প্রায় ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

এমনকি নদী ও জলাভূমির পানির তাপমাত্রাও প্রায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারত।

অর্থাৎ আজকের অ্যান্টার্কটিকার তুলনায় অঞ্চলটি ছিল অনেক উষ্ণ ও উদ্ভিদসমৃদ্ধ।

কিন্তু দক্ষিণ মেরুতে তো কয়েক মাস সূর্যের আলো থাকে না! এখানেই গল্পের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক অংশ।

অ্যান্টার্কটিকার মেরু অঞ্চলে আজও বছরের কয়েক মাস সূর্য ওঠে না।

প্রায় ৯ কোটি বছর আগেও পৃথিবীর অক্ষের অবস্থানের কারণে সেখানে দীর্ঘ মেরুর রাত থাকত।

অর্থাৎ সেই প্রাচীন বনকেও বছরের কয়েক মাস সূর্যালোক ছাড়াই টিকে থাকতে হতো।

গবেষকদের ধারণা, সেখানকার উদ্ভিদগুলো মৌসুমি আলোর পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজিত ছিল।

আজও পৃথিবীর কিছু উচ্চ অক্ষাংশের উদ্ভিদ দীর্ঘ শীত ও আলোর অভাবের সঙ্গে মানিয়ে বেঁচে থাকে।

তবে প্রাচীন অ্যান্টার্কটিকার পরিবেশ ছিল বর্তমানের তুলনায় অনেক উষ্ণ।

এত উষ্ণ ছিল কেন?

বিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের উচ্চ ঘনত্ব।

গবেষণায় ব্যবহৃত জলবায়ু মডেল অনুযায়ী, সেই সময়ের অ্যান্টার্কটিকায় এমন উষ্ণ পরিবেশ তৈরি হতে বায়ুমণ্ডলে CO₂-এর ঘনত্ব প্রায় ১,১২০ থেকে ১,৬৮০ ppm হতে হতো।

একই সঙ্গে দক্ষিণ মেরুর আশপাশে বর্তমানের মতো বিশাল স্থায়ী বরফচাদরের অনুপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কারণ বরফ সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৃথিবীকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।

বরফের পরিমাণ কমে গেলে ভূমি ও সমুদ্র বেশি সৌরশক্তি শোষণ করতে পারে।

এই আবিষ্কার এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

এই গবেষণা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, পৃথিবীর জলবায়ু ইতিহাসে কত বড় পরিবর্তন ঘটেছে।

আজ যে মহাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল অঞ্চল, অতীতে তার কিছু অংশে ছিল সবুজ বন ও জলাভূমি।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি।

এই আবিষ্কারের অর্থ এই নয় যে, ৯ কোটি বছর আগে অ্যান্টার্কটিকার প্রতিটি জায়গায় ঘন বন ছিল।

গবেষণাটি মূলত পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার একটি প্রাচীন উপকূলীয় পরিবেশের প্রমাণ তুলে ধরেছে।

একসময় যেখানে গাছের শিকড় মাটির গভীরে ছড়িয়ে ছিল, আজ সেই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস লুকিয়ে আছে সমুদ্রতলের পলিতে।

পৃথিবী যে স্থির কোনো জগৎ নয়, বরং কোটি কোটি বছর ধরে বদলে চলা এক অসাধারণ গ্রহ, এই আবিষ্কার তারই একটি চমৎকার উদাহরণ।

উৎস ও আরও পড়ুন

  1. https://doi.org/10.1038/s41586-020-2148-5
  2. https://www.bas.ac.uk/news/traces-of-rainforests-found-in-west-antarctica
  3. https://www.imperial.ac.uk/news/196516/traces-ancient-rainforest-antarctica-point-warmer

গল্পটি শেয়ার করুন

এই গল্পের বিষয় ও সূত্র ধরে নির্বাচিত আরও পাঠ।

সব গল্প দেখুন
৩০ কোটি বছর আগে পোকামাকড় এত বিশাল ছিল কেন? — নিবন্ধের চিত্র
প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবী৭ অক্টো, ২০২৬প্রায় ৩ মিনিট

৩০ কোটি বছর আগে পোকামাকড় এত বিশাল ছিল কেন?

কল্পনা করুন, প্রায় ৩০ কোটি বছর আগের পৃথিবী। চারদিকে জলাভূমি, বিশাল fern ও primitive গাছের বন। সেই আকাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে dragonfly-এর মতো দেখতে এক শিকারি পোকা, যার দুই ডানার বিস্তার প্রায় ৭০ সেন্টিমিটার

সম্পূর্ণ পড়ুন
পাথরে জমে থাকা ৫০ কোটি বছরের হারানো জগৎ — নিবন্ধের চিত্র
প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবী২৫ সেপ, ২০২৬প্রায় ২ মিনিট

পাথরে জমে থাকা ৫০ কোটি বছরের হারানো জগৎ

কানাডার Rocky Mountains-এর পাথরের ভেতর সেই হারিয়ে যাওয়া জগতের একটি অসাধারণ ছবি আজও আটকে আছে। জায়গাটির নাম Burgess Shale।

সম্পূর্ণ পড়ুন
গ্রহাণুর আঘাত ও ডাইনোসর দেখানো বিলুপ্তির কল্পচিত্র
প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবী৮ সেপ, ২০২৬প্রায় ২ মিনিট

ডাইনোসররা কিভাবে বিলুপ্ত হলো?

প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটে যায় এক ভয়াবহ ঘটনা, যা non-avian dinosaurs বা পাখি ছাড়া বাকি ডাইনোসরদের যুগের শেষ টেনে দেয়।

সম্পূর্ণ পড়ুন