সমুদ্রের নিচে হারানো প্রাচীন মিশরের বন্দরনগরী
কল্পনা করুন, প্রাচীন মিশরের একটি ব্যস্ত বন্দর। দূরদেশ থেকে জাহাজ আসছে, বণিকেরা পণ্য নামাচ্ছেন, মন্দিরে চলছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান। নীলনদের মোহনায় গড়ে ওঠা শহরটি তখন ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্
লেখক: পৃথিবীনামা

কল্পনা করুন, প্রাচীন মিশরের একটি ব্যস্ত বন্দর। দূরদেশ থেকে জাহাজ আসছে, বণিকেরা পণ্য নামাচ্ছেন, মন্দিরে চলছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান। নীলনদের মোহনায় গড়ে ওঠা শহরটি তখন ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
অথচ সেই শহরের ধ্বংসাবশেষ আজ সমুদ্রের নিচে।
শহরটির নাম থোনিস-হেরাক্লিয়ন (Thonis-Heracleion)। প্রাচীন মিশরীয়রা একে বলত Thonis, আর গ্রিকদের কাছে এটি পরিচিত ছিল Heracleion নামে। একসময় গবেষকেরা এই দুটি নামকে আলাদা শহরের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারে পরে নিশ্চিত হয়, দুটি নাম আসলে একই নগরীর। School of Archaeology খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকের দিকে গড়ে ওঠা শহরটি ছিল মিশরে প্রবেশকারী গ্রিক বণিকদের অন্যতম প্রধান বন্দর। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩১ সালে আলেকজান্দ্রিয়া প্রতিষ্ঠার আগে এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল অসাধারণ।
এখানে ছিল বিশাল মন্দির, নৌপথ, বন্দর এবং বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল দেবতা Amun-Gereb-এর মন্দির। Franck Goddio - Underwater Archaeologist কিন্তু সময়ের সঙ্গে শহরটির ভাগ্য বদলে যায়।
ভূমধ্যসাগরের পানি ধীরে ধীরে গ্রাস করতে থাকে নীলনদের বদ্বীপের এই অঞ্চলকে। একসময় নগরীর স্থাপনাগুলো সমুদ্রের নিচে হারিয়ে যায়।
শতাব্দীর পর শতাব্দী শহরটির অস্তিত্ব টিকে ছিল মূলত প্রাচীন লেখায় ও কিছু শিলালিপিতে। অবশেষে ২০০০ সালে, পানির নিচে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালিয়ে Franck Goddio-র নেতৃত্বাধীন গবেষকদল মিশরের Aboukir Bay-তে শহরটির ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করেন।
এরপর শুরু হয় একের পর এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। সমুদ্রতল থেকে উদ্ধার করা হয় বিশাল পাথরের মূর্তি, মন্দিরের অংশ, ধর্মীয় সামগ্রী, মুদ্রা ও প্রাচীন নৌযানের অবশেষ।
Oxford-এর গবেষণায় শহরটির বন্দর এলাকায় ৭০টিরও বেশি প্রাচীন জাহাজের অবশেষ শনাক্ত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর সবই যে দুর্ঘটনায় ডুবেছিল, তা নয়। কিছু জাহাজ পরিত্যক্ত হয়েছিল, কিছু ইচ্ছাকৃতভাবে ডোবানো হয়ে থাকতে পারে, আবার কিছু কাঠামো অন্য কাজে পুনর্ব্যবহৃত হয়েছিল।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর সমুদ্রের নিচে হারিয়ে গেল কীভাবে? গবেষকদের মতে, এর পেছনে একটিমাত্র বিপর্যয় নয়, বরং কয়েকটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সম্মিলিত প্রভাব ছিল।
শহরটি নির্মিত হয়েছিল নীলনদের বয়ে আনা নরম পলির ওপর। সময়ের সঙ্গে সেই পলি সংকুচিত হয়ে ভূমি নিচু হতে থাকে।
এর পাশাপাশি কিছু অঞ্চলে ঘটেছিল soil liquefaction। এই প্রক্রিয়ায় পানিসমৃদ্ধ মাটি চাপ বা কম্পনের প্রভাবে সাময়িকভাবে স্থিতিশীলতা হারাতে পারে। ফলে ওপরের ভারী স্থাপনাগুলো হঠাৎ বসে যেতে বা ভেঙে পড়তে পারে। ভূমিকম্প, অস্বাভাবিক বন্যা কিংবা সমুদ্রের ঢেউ এমন পরিস্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোন ঘটনা কতটা দায়ী ছিল, তা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
অষ্টম শতক নাগাদ থোনিস-হেরাক্লিয়ন সম্পূর্ণভাবে ভূমধ্যসাগরের নিচে হারিয়ে যায়। আজ প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সমুদ্রতলের পলি সরিয়ে ধীরে ধীরে সেই হারানো নগরীর ইতিহাস উদ্ধার করছেন।
যে বন্দরে একসময় দূরদেশের জাহাজ ভিড়ত, আজ সেখানে ইতিহাস খুঁজতে নামেন ডুবুরিরা। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক শহর যুদ্ধ বা আগুনে ধ্বংস হয়েছে। থোনিস-হেরাক্লিয়ন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কখনো কখনো একটি সমৃদ্ধ নগরী হারিয়ে যেতে পারে তার পায়ের নিচের মাটির পরিবর্তনের কারণেও।
উৎস ও আরও পড়ুন
গল্পটি শেয়ার করুন
এরপর পড়তে পারেন
এই গল্পের বিষয় ও সূত্র ধরে নির্বাচিত আরও পাঠ।

আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের নিচে ঘুমিয়ে থাকা ৩,৬০০ বছরের পুরোনো শহর
আজকের ঝলমলে পর্যটনদ্বীপ Santorini-র মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এমন এক শহর, যেখানে হাজার হাজার বছর আগের ঘরবাড়ি, রাস্তা, মৃৎপাত্র এমনকি রঙিন দেয়ালচিত্রও সময়ের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।
সম্পূর্ণ পড়ুন
মাটির ৮৫ মিটার নিচে এক নগরী!
কল্পনা করুন, আপনি একটি সাধারণ গ্রামের সরু পথ ধরে হাঁটছেন। চারদিকে বাড়িঘর, দোকানপাট আর মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
সম্পূর্ণ পড়ুন
পাথর কেটে গড়া পেত্রা: মরুভূমির বুকে হারিয়ে যাওয়া এক নগরী
ভাবুন এমন একটি শহরের কথা, যার ভবনগুলো ইট বা পাথর জোড়া দিয়ে তৈরি নয়, বরং পাহাড়ের গায়ে সরাসরি কেটে বানানো। জর্ডানের Petra ঠিক তেমনই এক বিস্ময়কর প্রাচীন নগরী, যা আজও পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত archaeological
সম্পূর্ণ পড়ুন