মাটির ৮৫ মিটার নিচে এক নগরী!
কল্পনা করুন, আপনি একটি সাধারণ গ্রামের সরু পথ ধরে হাঁটছেন। চারদিকে বাড়িঘর, দোকানপাট আর মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
লেখক: পৃথিবীনামা

কল্পনা করুন, আপনি একটি সাধারণ গ্রামের সরু পথ ধরে হাঁটছেন। চারদিকে বাড়িঘর, দোকানপাট আর মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
কিন্তু আপনার পায়ের নিচে লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ অন্য এক জগৎ!
সেখানে রয়েছে অসংখ্য ঘর, সরু সুড়ঙ্গ, খাবার সংরক্ষণের জায়গা, পানির কূপ, এমনকি উপাসনালয়ও।
সবকিছু তৈরি করা হয়েছে পাহাড়ের পাথর কেটে, মাটির অনেক গভীরে।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, তুরস্কে এমন একটি ভূগর্ভস্থ নগরী রয়েছে, যার গভীরতা প্রায় ৮৫ মিটার!
এর নাম Derinkuyu Underground City, বাংলায় দেরিনকুয়ু ভূগর্ভস্থ নগরী।
তুরস্কের ঐতিহাসিক কাপ্পাদোকিয়া অঞ্চলে অবস্থিত এই স্থাপনাটি প্রাচীন মানুষের নির্মাণদক্ষতার এক অসাধারণ নিদর্শন।
পাথরের নিচে এত বড় নগরী তৈরি হলো কীভাবে? কাপ্পাদোকিয়া অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক গঠন অন্য অনেক জায়গার চেয়ে আলাদা।
প্রাচীন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে তৈরি হওয়া ছাই দীর্ঘ সময় ধরে জমে এখানে বিশেষ ধরনের শিলা তৈরি করেছে।
এই শিলাকে বলা হয় Volcanic Tuff।
তুলনামূলক নরম হওয়ায় প্রাচীন মানুষের পক্ষে এই শিলা কেটে ঘর ও সুড়ঙ্গ তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল।
ধীরে ধীরে তৈরি হয় একের পর এক ভূগর্ভস্থ কক্ষ, যেগুলো সরু পথ ও সিঁড়ির মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, মানুষ মাটির এত গভীরে থাকতে চাইত কেন?
শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচার আশ্রয় দেরিনকুয়ু শুধু বসবাসের জন্য তৈরি একটি অদ্ভুত স্থাপনা ছিল না।
এটি ছিল বিপদের সময় আশ্রয় নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা।
UNESCO-র তথ্য অনুযায়ী, কাপ্পাদোকিয়ার ভূগর্ভস্থ বসতিগুলো বাইজান্টাইন যুগে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আরব আক্রমণের সময় স্থানীয় খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী এসব ভূগর্ভস্থ নগরীতে আশ্রয় নিত।
মাটির ওপরে বিপদ দেখা দিলে মানুষ নিচের নিরাপদ কক্ষগুলোতে চলে যেতে পারত।
এমনকি কিছু প্রবেশপথ ভেতর থেকে বিশাল গোলাকার পাথরের দরজা দিয়ে বন্ধ করা যেত।
ফলে বাইরে থেকে সহজে প্রবেশ করা সম্ভব হতো না।
কিন্তু এত গভীরে মানুষ শ্বাস নিত কীভাবে? এখানেই প্রাচীন নির্মাতাদের পরিকল্পনা বিস্মিত করে।
দেরিনকুয়ুর বিভিন্ন স্তরে রয়েছে বায়ু চলাচলের জন্য বিশেষ উল্লম্ব পথ।
এসব পথের মাধ্যমে ওপর থেকে বাতাস নিচের কক্ষগুলোতে পৌঁছাতে পারত।
তুরস্কের সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখানকার প্রায় ৫৫ মিটার গভীর একটি বায়ুচলাচলের পথ পানির কূপ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, কিছু পানির কূপের মুখ সরাসরি ভূপৃষ্ঠের সঙ্গে যুক্ত ছিল না।
এর একটি উদ্দেশ্য ছিল আক্রমণের সময় শত্রুপক্ষ যেন সহজে পানিতে বিষ মেশাতে না পারে।
মাটির নিচে ছিল প্রায় একটি ছোট শহরের সব সুবিধা! দেরিনকুয়ুর ভেতরে পাওয়া গেছে আস্তাবল, খাদ্য সংরক্ষণের কক্ষ, রান্না ও খাওয়ার জায়গা এবং ধর্মীয় উপাসনালয়।
সেখানে ছিল একটি শিক্ষাকক্ষও, যেটিকে গবেষকেরা খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে শনাক্ত করেছেন।
নিচের একটি স্তরে রয়েছে ক্রুশাকৃতির পরিকল্পনায় নির্মিত গির্জা।
অর্থাৎ বিপদের সময় শুধু কয়েক ঘণ্টা লুকিয়ে থাকার জন্য নয়, প্রয়োজন হলে একটি জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও সেখানে ছিল।
এই নগরী কত পুরোনো?
দেরিনকুয়ুর প্রাথমিক নির্মাণকাল নিয়ে এখনও কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কাপ্পাদোকিয়ায় বহু প্রাচীনকাল থেকেই পাথর কেটে আশ্রয় তৈরির প্রচলন ছিল।
তবে দেরিনকুয়ুর সব কক্ষ একই সময়ে নির্মিত হয়েছিল, এমন প্রমাণ নেই।
বিভিন্ন সময়ে এর অংশগুলো সম্প্রসারিত ও পরিবর্তিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
বিশেষ করে বাইজান্টাইন যুগে এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ বসতিগুলো আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
তাই দেরিনকুয়ুকে কোনো একটি নির্দিষ্ট বছরে সম্পূর্ণ নির্মিত নগরী হিসেবে বর্ণনা করা সঠিক হবে না।
হারিয়ে যাওয়া নগরী আবার সামনে এল কীভাবে? স্থানীয় সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৩ সালে দেরিনকুয়ুর ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটি আকস্মিকভাবে পুনরাবিষ্কৃত হয়।
এরপর অনুসন্ধান ও সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়।
১৯৬০-এর দশকে স্থাপনাটির কিছু অংশ দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
তবে আজও পুরো ভূগর্ভস্থ নগরী পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত নয়।
তুরস্কের সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এর প্রায় ১০ শতাংশ অংশ দর্শনার্থীরা ঘুরে দেখতে পারেন।
ইতিহাসের এক অসাধারণ শিক্ষা আমরা সাধারণত প্রাচীন নগরী বলতে বিশাল প্রাসাদ, উঁচু দেয়াল কিংবা পাথরের মন্দির কল্পনা করি।
কিন্তু দেরিনকুয়ু আমাদের দেখায় ইতিহাসের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দিক।
কখনো কখনো মানুষ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আকাশের দিকে উঁচু স্থাপনা তৈরি করেনি।
বরং পাথর কেটে নেমে গেছে মাটির অনেক গভীরে।
সেখানে তৈরি করেছে ঘর, রাস্তা, পানির ব্যবস্থা এবং নিরাপদ আশ্রয়।
যে নগরীকে বাইরে থেকে দেখা যায় না, তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে মানুষের টিকে থাকার এক অসাধারণ ইতিহাস!
উৎস ও আরও পড়ুন
গল্পটি শেয়ার করুন
এরপর পড়তে পারেন
এই গল্পের বিষয় ও সূত্র ধরে নির্বাচিত আরও পাঠ।

সমুদ্রের নিচে হারানো প্রাচীন মিশরের বন্দরনগরী
কল্পনা করুন, প্রাচীন মিশরের একটি ব্যস্ত বন্দর। দূরদেশ থেকে জাহাজ আসছে, বণিকেরা পণ্য নামাচ্ছেন, মন্দিরে চলছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান। নীলনদের মোহনায় গড়ে ওঠা শহরটি তখন ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্
সম্পূর্ণ পড়ুন
আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের নিচে ঘুমিয়ে থাকা ৩,৬০০ বছরের পুরোনো শহর
আজকের ঝলমলে পর্যটনদ্বীপ Santorini-র মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এমন এক শহর, যেখানে হাজার হাজার বছর আগের ঘরবাড়ি, রাস্তা, মৃৎপাত্র এমনকি রঙিন দেয়ালচিত্রও সময়ের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।
সম্পূর্ণ পড়ুন
পাথর কেটে গড়া পেত্রা: মরুভূমির বুকে হারিয়ে যাওয়া এক নগরী
ভাবুন এমন একটি শহরের কথা, যার ভবনগুলো ইট বা পাথর জোড়া দিয়ে তৈরি নয়, বরং পাহাড়ের গায়ে সরাসরি কেটে বানানো। জর্ডানের Petra ঠিক তেমনই এক বিস্ময়কর প্রাচীন নগরী, যা আজও পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত archaeological
সম্পূর্ণ পড়ুন