সমুদ্রের ‘ভুয়া তলদেশ’ রাতে কোথায় যায়?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সমুদ্রের গভীরতা মাপতে গিয়ে এক অদ্ভুত ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন নৌবাহিনীর sonar operators।
লেখক: পৃথিবীনামা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সমুদ্রের গভীরতা মাপতে গিয়ে এক অদ্ভুত ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন নৌবাহিনীর sonar operators।
তাঁদের যন্ত্রে সমুদ্রের তলদেশের মতো একটি স্তর দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, দিনের বেলায় স্তরটি থাকত অনেক গভীরে, আর রাত নামলেই সেটি ওপরে উঠে আসত! সমুদ্রের তলদেশ কি তাহলে সত্যিই ওঠানামা করে?
না। বিজ্ঞানীরা পরে আবিষ্কার করেন, এটি আসলে সমুদ্রের তলদেশই নয়! সেখানে ছিল অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীর বিশাল সমাবেশ।
ছোট মাছ, চিংড়ির মতো crustacean, jellyfish এবং নানা ধরনের zooplankton একসঙ্গে এমন ঘন স্তর তৈরি করেছিল যে sonar-এর শব্দতরঙ্গ সেখান থেকে প্রতিফলিত হয়ে একটি ভুয়া সমুদ্রতল বা False Bottom তৈরি করছিল।
বিজ্ঞানীরা এই স্তরের নাম দেন Deep Scattering Layer (DSL)। সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ মিটার গভীরে এমন স্তর শনাক্ত করা যায়। NOAA Ocean Exploration কিন্তু রাতে প্রাণীগুলো ওপরে উঠে আসে কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলে।
সমুদ্রের ওপরের স্তরে সূর্যের আলো পৌঁছায়। সেখানে phytoplankton সূর্যালোক ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি করে। ফলে ওপরের পানিতে ছোট ছোট প্রাণীর জন্য প্রচুর খাবার পাওয়া যায়। কিন্তু দিনের বেলায় সেখানে গেলে বিপদ!
কারণ অনেক শিকারি মাছ আলো ব্যবহার করে শিকার খুঁজে বের করে। তাই অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণী দিনের বেলা গভীর, অন্ধকার পানিতে আশ্রয় নেয়। সূর্য ডুবে গেলে তারা খাবারের সন্ধানে ওপরের দিকে উঠে আসে।
আর ভোর হওয়ার আগেই আবার গভীর পানিতে ফিরে যায়। NOAA Ocean Exploration এই ঘটনাকে বলা হয় Diel Vertical Migration (DVM)। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রাণীর সংখ্যা ও সম্মিলিত জীবভরের বিচারে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দৈনিক প্রাণী-অভিবাসন।
প্রতিদিন কোটি কোটি নয়, শত শত কোটি সামুদ্রিক প্রাণী এই যাত্রায় অংশ নেয়। কিছু প্রাণী কয়েক শ মিটার পর্যন্ত ওপরে উঠে আসে। আবার সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একই পথ ধরে নিচে নেমে যায়।
আরও অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই বিশাল অভিবাসন শুধু সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়।
পৃথিবীর জলবায়ুর সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
কীভাবে?
সমুদ্রের ওপরের স্তরে phytoplankton বাতাস ও পানিতে থাকা carbon dioxide ব্যবহার করে জৈব পদার্থ তৈরি করে।
ছোট সামুদ্রিক প্রাণীরা সেই phytoplankton খায়। এরপর তারা যখন গভীর পানিতে ফিরে যায়, তখন খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করা carbon-ও নিচে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের বর্জ্য, মৃতদেহ ও অন্যান্য জৈব পদার্থের কিছু অংশ আরও গভীরে ডুবে যায়। এই প্রক্রিয়া সমুদ্রের Biological Carbon Pump-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি বায়ুমণ্ডল থেকে শোষিত কার্বনের একটি অংশ দীর্ঘ সময় গভীর সমুদ্রে ধরে রাখতে সাহায্য করে।
তবে সব গভীর সমুদ্রের প্রাণী প্রতিদিন এই যাত্রায় অংশ নেয় না। প্রজাতি, আলো, খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং শিকারির উপস্থিতি অনুযায়ী তাদের চলাচল ভিন্ন হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা এখনও গবেষণা করছেন, এই বিশাল দৈনিক অভিবাসন ঠিক কতটা কার্বন গভীর সমুদ্রে পৌঁছে দেয় এবং জলবায়ু পরিবর্তন এর ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে। NOAA Ocean Exploration আমরা সাধারণত প্রাণীদের অভিবাসন বলতে পাখির দীর্ঘ আকাশযাত্রা কিংবা আফ্রিকার তৃণভূমিতে হাজার হাজার প্রাণীর চলাচল কল্পনা করি।
অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দৈনিক প্রাণী-অভিবাসনগুলোর একটি ঘটে আমাদের চোখের আড়ালে, সমুদ্রের গভীরে।
প্রতি রাতে অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণী অন্ধকার গভীরতা থেকে খাবারের সন্ধানে ওপরে উঠে আসে। আর ভোর হওয়ার আগেই আবার অদৃশ্য হয়ে যায়।
উৎস ও আরও পড়ুন
গল্পটি শেয়ার করুন
এরপর পড়তে পারেন
এই গল্পের বিষয় ও সূত্র ধরে নির্বাচিত আরও পাঠ।

মৃত তিমি থেকে জন্ম নেয় নতুন জীবন!
কল্পনা করুন, সমুদ্রের কয়েক হাজার মিটার নিচে এক বিশাল তিমির মৃতদেহ পড়ে আছে।
সম্পূর্ণ পড়ুন
অক্টোপাসের তিনটি হৃদপিণ্ড আর নীল রক্ত কেন?
একটি হৃদপিণ্ড আমাদের পুরো শরীরে রক্ত পৌঁছে দিতে যথেষ্ট। কিন্তু অক্টোপাসের শরীরের ভেতরে কাজ করছে তিনটি হৃদপিণ্ড। শুধু তাই নয়, আমাদের রক্ত যেখানে লাল, অক্টোপাসের রক্ত সেখানে সত্যিই নীল।
সম্পূর্ণ পড়ুন
সমুদ্রের তলায় আবার লেক? এই অদ্ভুত জলাশয় তৈরি হয় কীভাবে?
একটি লেকের তলায় আরেকটি লেক। কথাটা অসম্ভব মনে হলেও গভীর সমুদ্রের কিছু জায়গায় সত্যিই এমন দৃশ্য দেখা যায়। চারদিকে স্বাভাবিক সমুদ্রের পানি, অথচ সমুদ্রতলের একটি নিচু জায়গায় আলাদা পৃষ্ঠ ও তীররেখার মতো সীমান
সম্পূর্ণ পড়ুন