ইতিহাসপ্রায় ৩ মিনিটের পাঠ

পাঁচ দিন লন্ডন ঢেকে ছিল বিষাক্ত কুয়াশায়!

১৯৫২ সালের ৫ ডিসেম্বর। শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠে লন্ডনের মানুষ দেখলেন, শহরজুড়ে কুয়াশা।

লেখক: পৃথিবীনামা

GreatSmogOfLondon বিশ্বইতিহাস AirPollution London1952 ইতিহাসgreat smog of london 1952 GreatSmogOfLondon বিশ্বইতিহাস AirPollution London1952 ইতিহাস
পাঁচ দিন লন্ডন ঢেকে ছিল বিষাক্ত কুয়াশায়! — নিবন্ধের চিত্র

১৯৫২ সালের ৫ ডিসেম্বর। শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠে লন্ডনের মানুষ দেখলেন, শহরজুড়ে কুয়াশা।

লন্ডনে কুয়াশা নতুন কিছু নয়। তাই প্রথমে কেউ খুব একটা গুরুত্ব দিলেন না।

কিন্তু দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা ঘন হতে লাগল। চারপাশ অস্বাভাবিক হলুদাভ ও কালচে হয়ে উঠল। একসময় পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে মানুষ নিজের পায়ের কাছের রাস্তাও ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিলেন না!

রাস্তায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হলো। বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেল অনেক জায়গায়। বিষাক্ত ধোঁয়ামিশ্রিত কুয়াশা ঘরের ভেতরেও ঢুকতে শুরু করল।

কেউ তখনও পুরোপুরি বুঝতে পারেননি, লন্ডন ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বায়ুদূষণ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে।

ঘটনাটি ইতিহাসে পরিচিত The Great Smog of London নামে। London Museum কিন্তু কুয়াশা এত ভয়ংকর হয়ে উঠল কেন?

১৯৫২ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে লন্ডনে প্রচণ্ড শীত পড়েছিল।

শীত থেকে বাঁচতে মানুষ ঘরে ঘরে কয়লা পোড়াচ্ছিলেন। একই সঙ্গে কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া বের হচ্ছিল।

সাধারণত এসব ধোঁয়া ওপরের দিকে উঠে বাতাসে ছড়িয়ে যায়। কিন্তু সেদিন প্রকৃতি তৈরি করেছিল এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি।

লন্ডনের ওপর একটি উচ্চচাপ বলয় তৈরি হয়েছিল। এর ফলে ভূমির কাছের ঠান্ডা বাতাসের ওপরে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ বাতাসের স্তর অবস্থান করছিল।

বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Temperature Inversion। এই উষ্ণ স্তরটি অনেকটা ঢাকনার মতো কাজ করছিল। নিচের দূষিত বাতাস সহজে ওপরে উঠতে পারছিল না।

ফলে কয়লার ধোঁয়া, ক্ষতিকর গ্যাস এবং কুয়াশার জলকণা মাটির কাছাকাছি জমতে থাকে।

কুয়াশার আড়ালে ছিল বিষাক্ত রাসায়নিক!

কয়লা পোড়ানোর ফলে বাতাসে বিপুল পরিমাণ Sulfur Dioxide ছড়িয়েছিল। এই গ্যাসের একটি অংশ বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় Sulfuric Acid-এ রূপান্তরিত হয়। ব্রিটিশ আবহাওয়া সংস্থা Met Office-এর হিসাব অনুযায়ী, বিপর্যয়ের সময় প্রতিদিন প্রায় ৩৭০ টন Sulfur Dioxide থেকে ৮০০ টন Sulfuric Acid তৈরি হয়েছিল।

ভাবুন, মানুষ যে বাতাসে শ্বাস নিচ্ছিলেন, সেটিই হয়ে উঠেছিল ক্ষতিকর কণা ও রাসায়নিক পদার্থে পরিপূর্ণ।

পাঁচ দিনের সেই বিপর্যয়ে কত মানুষ মারা গিয়েছিলেন? ৫ ডিসেম্বর শুরু হওয়া বিষাক্ত কুয়াশা ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই কয়েক দিনে লন্ডনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের সমস্যায় অসংখ্য মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ এবং আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন। প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৪,০০০ মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যুর কথা উঠে আসে।

কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় আরও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া যায়। ২০০১ সালে Environmental Health Perspectives জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ডিসেম্বর

১৯৫২ থেকে ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ পর্যন্ত মৃত্যুর তথ্য পুনর্বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকদের অনুমান অনুযায়ী, দূষণের তাৎক্ষণিক ও পরবর্তী প্রভাব মিলিয়ে প্রায় ১২,০০০ অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটে থাকতে পারে।

এটি গবেষণাভিত্তিক অনুমান, প্রতিটি মৃত্যুর কারণ পৃথকভাবে নিশ্চিত করার ফল নয়।

এই বিপর্যয় বদলে দিয়েছিল ব্রিটেনের আইন Great Smog-এর পর বায়ুদূষণকে শুধু অস্বস্তিকর পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ আর থাকল না।

মানুষ বুঝতে পারলেন, দূষিত বাতাসও একটি বড় জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৬ সালে ব্রিটেনে পাস হয় Clean Air Act।

এই আইনে ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট এলাকায় কম ধোঁয়া উৎপন্নকারী জ্বালানি ব্যবহারের নিয়ম এবং শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণের বিধান আনা হয়। পরবর্তী দশকগুলোতে এসব উদ্যোগ লন্ডনের কয়লাভিত্তিক ধোঁয়াদূষণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইতিহাসের শিক্ষা

লন্ডনের Great Smog আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেয়। প্রকৃতির একটি সাধারণ ঘটনা, যেমন কুয়াশা, মানুষের তৈরি দূষণের সঙ্গে মিশে ভয়াবহ বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বায়ুদূষণ সবসময় চোখে দেখা যায় না। ১৯৫২ সালের লন্ডনের বিষাক্ত কুয়াশা একসময় সরে গিয়েছিল। কিন্তু সেই পাঁচ দিনের ঘটনা আজও পৃথিবীর শহরগুলোকে পরিষ্কার বাতাসের গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়।

যে বাতাস আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, সেই বাতাসই দূষিত হলে হয়ে উঠতে পারে নীরব বিপদ।

উৎস ও আরও পড়ুন

  1. https://weather.metoffice.gov.uk/learn-about/weather/case-studies/great-smog
  2. https://www.londonmuseum.org.uk/collections/london-stories/the-great-smog-of-1952
  3. https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC1240556/

গল্পটি শেয়ার করুন

এই গল্পের বিষয় ও সূত্র ধরে নির্বাচিত আরও পাঠ।

সব গল্প দেখুন
যেদিন বোস্টনের রাস্তায় মোলাসেসের বন্যা নেমেছিল — নিবন্ধের চিত্র
ইতিহাস২২ সেপ, ২০২৬প্রায় ২ মিনিট

যেদিন বোস্টনের রাস্তায় মোলাসেসের বন্যা নেমেছিল

১৯১৯ সালের ১৫ জানুয়ারি। যুক্তরাষ্ট্রের Boston শহরের North End এলাকায় দুপুরের ব্যস্ততা চলছিল। Commercial Street-এর পাশে দাঁড়িয়ে ছিল প্রায় ৫০ ফুট উঁচু একটি বিশাল ইস্পাতের ট্যাংক, যার ভেতরে জমা ছিল প্রায়

সম্পূর্ণ পড়ুন
১৮১৬ সালে গ্রীষ্ম কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল? — নিবন্ধের চিত্র
ইতিহাস৬ অক্টো, ২০২৬প্রায় ২ মিনিট

১৮১৬ সালে গ্রীষ্ম কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল?

১৮১৬ সালের জুন। উত্তর আমেরিকার কিছু অঞ্চলে তখন গ্রীষ্ম আসার কথা। অথচ দেখা গেল তুষার আর ভয়ংকর ঠান্ডা। ইউরোপের বহু জায়গায় গ্রীষ্ম হয়ে উঠল অস্বাভাবিক ঠান্ডা ও বৃষ্টিময়। ফসল নষ্ট হলো, খাদ্যের দাম বাড়ল, মা

সম্পূর্ণ পড়ুন
সমুদ্রের নিচে হারানো প্রাচীন মিশরের বন্দরনগরী — নিবন্ধের চিত্র
হারানো স্থান৮ অক্টো, ২০২৬প্রায় ৩ মিনিট

সমুদ্রের নিচে হারানো প্রাচীন মিশরের বন্দরনগরী

কল্পনা করুন, প্রাচীন মিশরের একটি ব্যস্ত বন্দর। দূরদেশ থেকে জাহাজ আসছে, বণিকেরা পণ্য নামাচ্ছেন, মন্দিরে চলছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান। নীলনদের মোহনায় গড়ে ওঠা শহরটি তখন ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্

সম্পূর্ণ পড়ুন