৩,৭০০ বছর আগের ক্রেতার অভিযোগ!
কল্পনা করুন, আপনি একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ভালো মানের তামা কেনার জন্য টাকা দিয়েছেন। কিন্তু পণ্য নিতে গিয়ে দেখলেন, প্রতিশ্রুত মানের তামা দেওয়া হচ্ছে না।
লেখক: পৃথিবীনামা

কল্পনা করুন, আপনি একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ভালো মানের তামা কেনার জন্য টাকা দিয়েছেন। কিন্তু পণ্য নিতে গিয়ে দেখলেন, প্রতিশ্রুত মানের তামা দেওয়া হচ্ছে না।
আপনি অভিযোগ জানালেন। ব্যবসায়ী আপনার অভিযোগ গুরুত্ব দিলেন না। উল্টো আপনার পাঠানো লোকের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করলেন!
এমন পরিস্থিতিতে আজ হলে হয়তো আপনি অনলাইনে অভিযোগ করতেন, কিংবা ব্যবসায়ীকে নেতিবাচক রিভিউ দিতেন।
কিন্তু প্রায় ৩,৭০০ বছর আগে মানুষ কী করত? অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার একজন ক্রেতা ঠিক এমন একটি ঘটনা নিয়ে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।
আর সেই অভিযোগ আজও সংরক্ষিত আছে! যে অভিযোগ টিকে আছে হাজার হাজার বছর ঘটনাটি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ সালের।
বর্তমান ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত প্রাচীন Ur নগরীতে ব্যবসা করতেন ইয়া-নাসির (Ea-nāṣir) নামে এক তামা ব্যবসায়ী।
তিনি Dilmun অঞ্চলের সঙ্গে তামার বাণিজ্যে যুক্ত ছিলেন। একদিন নান্নি (Nanni) নামের এক ক্রেতার সঙ্গে তাঁর তামা সরবরাহ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। নান্নির অভিযোগ ছিল, ব্যবসায়ী ভালো মানের তামা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তাঁর পাঠানো প্রতিনিধিকে নিম্নমানের তামার খণ্ড দেখিয়েছিলেন।
শুধু তাই নয়, প্রতিনিধির সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং টাকা ফেরত ও পণ্য সরবরাহ নিয়ে সমস্যার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছিল।
কাগজ নয়, অভিযোগ লেখা হয়েছিল মাটির ফলকে! সেই যুগে আজকের মতো কাগজে চিঠি লেখা সাধারণ ব্যবস্থা ছিল না।
মেসোপটেমিয়ার মানুষ ভেজা মাটির ফলকের ওপর বিশেষ লেখনী দিয়ে চিহ্ন তৈরি করতেন। এই লিখনপদ্ধতির নাম Cuneiform বা কীলকাকার লিপি।
নান্নির অভিযোগটিও লেখা হয়েছিল আক্কাদীয় ভাষায়, একটি ছোট মাটির ফলকের ওপর। ফলকটির দৈর্ঘ্য মাত্র ১১.৬ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ৫ সেন্টিমিটার।
অথচ এই ছোট্ট ফলকের ভেতরেই সংরক্ষিত রয়েছে হাজার হাজার বছর আগের একটি ব্যবসায়িক বিরোধের বিবরণ!
অভিযোগে কী লেখা ছিল?
নান্নি ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর পাঠানো প্রতিনিধিকে ভালো মানের তামার বদলে নিম্নমানের তামা দেখানো হয়েছিল।
এমনকি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিকে তামা নিতে না চাইলে চলে যেতে বলেছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
নান্নি আরও অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর পাঠানো লোকদের কয়েকবার খালি হাতে ফিরে আসতে হয়েছে। অথচ তাদের যাতায়াত করতে হয়েছিল বিপজ্জনক অঞ্চলের মধ্য দিয়ে। চিঠির শেষদিকে নান্নি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, ভবিষ্যতে তিনি ভালো মানের তামা ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করবেন না।
তিনি নিজেই তামার খণ্ড পরীক্ষা করে বেছে নেওয়ার কথাও জানান। Guinness World Records এত পুরোনো অভিযোগ বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেলেন কীভাবে?
১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে প্রত্নতাত্ত্বিক Leonard Woolley-এর নেতৃত্বে প্রাচীন উর নগরীতে খননকাজ পরিচালিত হয়।
সেখানে পাওয়া যায় অসংখ্য মাটির ফলক।
এর মধ্যে ছিল ইয়া-নাসিরের ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কিছু চিঠি ও নথি। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, নান্নিই একমাত্র অসন্তুষ্ট ক্রেতা ছিলেন না!
অন্য কয়েকজনের চিঠিতেও তামা সরবরাহ এবং পণ্যের মান নিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ হাজার হাজার বছর আগেও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ক্রেতাদের অভিযোগ নতুন কিছু ছিল না।
এটি কি পৃথিবীর প্রথম অভিযোগপত্র? Guinness World Records এটিকে বিশ্বের প্রাচীনতম পরিচিত লিখিত ক্রেতা-অভিযোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানবসভ্যতায় এর আগে কেউ কখনো অভিযোগ করেননি। এটি এখন পর্যন্ত পাওয়া এবং শনাক্ত করা সবচেয়ে পুরোনো লিখিত ক্রেতা-অভিযোগের নিদর্শন। ফলকটি British Museum-এর সংগ্রহের অংশ। ২০২৫ সাল থেকে এটি আবুধাবির Zayed National Museum-এ অস্থায়ী প্রদর্শনীর জন্য পাঠানো হয়েছে।
তবে নান্নি শেষ পর্যন্ত তাঁর টাকা ফেরত পেয়েছিলেন কি না, কিংবা ব্যবসায়ী তাঁর অভিযোগের কোনো সমাধান করেছিলেন কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।
হাজার বছরেও মানুষের কিছু অভ্যাস বদলায়নি!
আজ আমরা অনলাইনে পণ্যের মান নিয়ে অভিযোগ করি, খারাপ রিভিউ দিই, টাকা ফেরত চাই। প্রায় ৩,৭০০ বছর আগেও মানুষ একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতেন। পার্থক্য শুধু প্রযুক্তিতে।
আজকের ক্রেতা অভিযোগ লেখেন মোবাইলের পর্দায়। আর প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার নান্নি লিখেছিলেন মাটির ফলকে।
হাজার হাজার বছর পেরিয়ে সেই অভিযোগ আজ আমাদের সামনে তুলে ধরছে প্রাচীন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক আশ্চর্য গল্প।
ইতিহাস শুধু রাজা, যুদ্ধ আর সাম্রাজ্যের গল্প নয়। কখনো কখনো একটি ছোট্ট অভিযোগপত্রও আমাদের জানিয়ে দেয়, অতীতের মানুষ আমাদের কতটা কাছাকাছি ছিলেন!
উৎস ও আরও পড়ুন
গল্পটি শেয়ার করুন
এরপর পড়তে পারেন
এই গল্পের বিষয় ও সূত্র ধরে নির্বাচিত আরও পাঠ।

দুই হাজার বছর আগের এই যন্ত্র কীভাবে আকাশের হিসাব রাখত?
সমুদ্রের তলায় প্রায় দুই হাজার বছর পড়ে ছিল কিছু ক্ষয়ে যাওয়া ব্রোঞ্জের টুকরো। প্রথম দেখায় সেগুলোকে অসাধারণ কিছু মনে হওয়ার কারণ ছিল না। কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে ছিল একের পর এক সূক্ষ্ম দাঁতওয়ালা gear। যন্ত্রটি
সম্পূর্ণ পড়ুন
সমুদ্রের বুকে পাথরের রহস্যময় নগরী
প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে একটি দ্বীপের উপকূলে ছড়িয়ে আছে শতাধিক ছোট ছোট কৃত্রিম দ্বীপ। তাদের মাঝখান দিয়ে চলে সরু জলপথ। আর দ্বীপগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে বিশাল কালো basalt পাথরের দেয়াল, প্রাসাদ, সমাধি আর ধ
সম্পূর্ণ পড়ুন
মাটির ৮৫ মিটার নিচে এক নগরী!
কল্পনা করুন, আপনি একটি সাধারণ গ্রামের সরু পথ ধরে হাঁটছেন। চারদিকে বাড়িঘর, দোকানপাট আর মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
সম্পূর্ণ পড়ুন